হজ্জ

হজ্জ ইসলামের পাঁচটি আরকান বা স্তম্ভের পঞ্চমটি। হজ্জের আভিধানিক অর্থ ‘কোথাও যাওয়ার ইচ্ছা করা’, ‘সংকল্প করা’ বা ‘চক্রাকারে প্রদক্ষিণ করা’। শরিয়তের পরিভাষায় নির্দিষ্ট মাসের নির্দিষ্ট সময়কালে কা’বা ঘর প্রদক্ষিণ, আরাফাত ময়দানে অবস্থান, সাফা ও মারওয়ার মধ্যবর্তী স্থানে গমনাগমন, মিনায় অবস্থান প্রভৃতি কার্য  হযরত মুহাম্মাদ (স.) কর্তৃক নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় সম্পাদন করার নামই হজ্জ।

পবিত্র কুরআনে উল্লিখিত হয়েছে যে, পৃথিবীতে আল্লাহ-তায়ালার ইবাদতের জন্য নির্মিত প্রথম ইমারত হচ্ছে মক্কাস্থ পবিত্র কা’বা (৩ঃ৯৬), যা ‘বায়তুল্লাহ’ বা ‘আল্লাহর ঘর’ নামে অভিহিত। আল্লাহ হযরত ইব্রাহিমকে (আ.) আদেশ দেন: ‘আমার গৃহকে পবিত্র রাখিও তাহাদের জন্য যাহারা তাওয়াফ করে এবং যাহারা সালাত-এ দাঁড়ায়, রুকু করে ও সিজদা করে। এবং মানুষের নিকট হজ্জের ঘোষণা করিয়া দাও, উহারা তোমার নিকট আসিবে পদব্রজে ও সর্বপ্রকার দ্রুতগামী উষ্ট্রের পৃষ্ঠে, উহারা আসিবে দূর-দুরান্তরের পথ অতিক্রম করিয়া।’ (আল-কুরআন, ২২ঃ২৬, ২৭)। এই আদেশের পরিপ্রেক্ষিতে হযরত ইব্রাহিম (আ.) সর্বপ্রথম কা’বাকে কেন্দ্র করে হজ্জের প্রবর্তন করেন। তাঁর আহবানে লোকেরা মক্কায় হজ্জ সম্পাদন করার জন্য আসতে থাকে। তিনি ও পুত্র ইসমাঈল (আ.) কা’বা ঘর পুনর্নির্মাণ করেন (২ঃ১২৭)। তখন থেকে  প্রতি বছর বিভিন্ন এলাকা থেকে লোকজন কা’বা শরীফে হজ্জ নিমিত্ত সমবেত হতে থাকে।

পরে এক পর্যায়ে কা’বায় ৩৬০টি দেবমূর্তি প্রতিষ্ঠিত হয় এবং আল্লাহর পরিবর্তে তাঁদের এবাদত চলতে থাকে। সেই সঙ্গে নানাবিধ অন্যায় ও অশালীন অনুষ্ঠানও উদ্যাপিত হতে থাকে। এসব কারণে নবম হিজরিতে হযরত মুহাম্মাদ (স.) হজ্জ পালন করতে যাননি; আবু বকর (রা.)-এর নেতৃত্বে তিনশ সাহাবির একটি দল পাঠানো হয়। দশম হিজরিতে নবী করিম (স.) স্বয়ং হজ্জের নেতৃত্ব দেন। হজ্জ কীভাবে পালন করা উচিত তা তিনি এই হজ্জে নির্দিষ্ট করে দেন। এ বছর হজ্জ যুল হিজ্জা মাসে সম্পন্ন হয়। ইতিহাসে এই হজ্জ ‘বিদায়ী হজ্জ’ নামে অভিহিত। এ বছর থেকেই ‘নাসী’ প্রথার বিলোপ সাধন করে খাঁটি চান্দ্র বছরের প্রচলন হয় এবং যুল হিজ্জার কয়েকটি দিন হজ্জের সময় হিসেবে নির্ধারিত হয়।

হজ্জ মুসলমানদের জন্য ফরজ। শরিয়ত অনুযায়ী নারী-পুরুষ নির্বিশেষে প্রত্যেক মুসলমানের জন্য জীবনে অন্তত একবার হজ্জ করা অবশ্য কর্তব্য, যদি তার পক্ষে সম্ভম হয় (৩ঃ৯৭)। হজ্জ পালনের শর্ত হলো: প্রাপ্ত বয়স, শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা, ব্যক্তি স্বাধীনতা, আর্থিক স্বচ্ছলতা, পথের নিরাপত্তা এবং ফিরে আসা পর্যন্ত পরিবারের সদস্যবৃন্দের ভরণ-পোষণের নিশ্চয়তা। মহিলাদের ক্ষেত্রে স্বামী বা অবিবাহযোগ্য কোনো আত্মীয়কে সহযাত্রী করা আবশ্যক।

জীবদ্দশায় হজ্জ করতে পারেনি এমন ব্যক্তি বদলি হজ্জের ওয়াসিয়াত করতে পারে। সে মারা গেলে তার সম্পত্তি থেকে কাফন-দাফনের খরচ ও তার ঋণ থাকলে তা পরিশোধের পর যা অবশিষ্ট থাকে তার এক-তৃতীয়াংশ দ্বারা হজ্জের ব্যয় নির্বাহ সম্ভব হলে ওয়ারিশদের ওপর তার পক্ষে হজ্জ করা ওয়াজিব হয়। হজ্জের ফরজ হলো: ইহরাম; আরাফাতে ওয়াকুফ ও তাওয়াফ আল-ইফাদা ১০, ১১ বা ১২ যুল হিজ্জা তারিখে তাওয়াফ আল-ইফাদা করা হয়, তবে প্রথম দিবসেই এটি সম্পন্ন করা শ্রেয়; উপর্যুক্ত ফরজ কাজগুলি নিয়মানুযায়ী পরপর সমাধা করা।

হজ্জের ওয়াজিব হলো: মুযদালিফাতে উকুফ, সাঈ, রাময়ি (অর্থাৎ  মীনাতে পাথর নিক্ষেপ), হালক (কেশ মুন্ডন) বা তাকশির (কেশ ছোট করা) এবং কিরান ও তামাত্তু (কুরবানি করা)। ইহরাম, তাওয়াফ ও উকুফ সংক্রান্ত আরও কিছু কাজ ওয়াজিব বলে বিবেচিত হয়।

হজ্জ তিন প্রকারে সম্পন্ন করা যায়:  ইফরাদ, অর্থাৎ শুধুমাত্র হজ্জের ইহরাম করা ও উমরাহ্ ব্যতীত হজ্জ করা; কিরান, অর্থাৎ উমরা ও হজ্জ উমরার ইহরাম এক সঙ্গে করা; উমরা সম্পাদন করে পরে হজ্জ করতে হয়; তামাত্তু, অর্থাৎ প্রথমে শুধু উমরার ইহরাম করা ও উমরা শেষে ইহরাম থেকে মুক্ত হওয়া এবং পরে  পুনরায় হজ্জের ইহরাম করা ও হজ্জ সম্পাদন করা। হজ্জের অনুষ্ঠানগুলি পবিত্র পরিবেশ ও অবস্থার মধ্যে সম্পন্ন করতে হয় বিধায় ইহরাম অপরিহার্য। মক্কা থেকে দূরে যাদের বাড়ি তাদেরকে মক্কা যাওয়ার পথে নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছে সেখানেই ইহরাম সম্পন্ন করতে হয়। এই নির্দিষ্ট স্থানকে বলা হয় ‘মীকাত’। হজ্জের দিন ছাড়া অন্যদিন গেলে উমরা বা ছোট হজ্জ পালন করতে হয়। উমরার জন্য কোনো দিন-তারিখ নির্দিষ্ট নেই। কা’বা ঘরে সাতবার তাওয়াফ এবং সাফা ও মারওয়ায় সাতবার সাঈ সম্পন্ন হলেই উমরা সম্পন্ন হয়।

কেউ কেউ হজ্জকে প্রাক ইসলামি ও ইসলামি এই দুই ভাগে বিভক্ত করে দেখাতে চেয়েছেন যে, হযরত মুহাম্মাদ (স.) আরবের মুশরিকদের হজ্জকেই কিছু সংস্কার করে পুনরায় প্রবর্তন করেছেন। কিন্তু এটি একটি ভ্রান্ত মত। প্রকৃতপক্ষে রসুল করিম (স.) হযরত ইব্রাহিম প্রবর্তিত তৌহিদভিত্তিক হজ্জকেই ইসলামের একত্ববাদী আদর্শে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করেন।

অনুমান করা হয় যে, বাংলাদেশে মুসলিম বিজয় ও  ইসলাম প্রচারের পর থেকেই ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরা হজ্জ পালন করে আসছেন। পনেরো শতকে নূর কুতবে আলম কয়েকবার হজ্জ পালন করেন।  শাহ সুজা আরাকান হয়ে হজ্জের সময় মক্কায় যাবেন এরূপ বাসনা নিয়ে সপরিবারে  ঢাকা ত্যাগ করেন। হাজী মুহাম্মদ মহসিন মক্কায় হজ্জ পালন করেন। হাজী শরিয়তুল্লাহও একই উদ্দেশ্যে মক্কা পরিদর্শন করেন। ব্রিটিশ আমলে বাংলাদেশের মুসলি­গণ মুম্বাই হয়ে জাহাজযোগে হজ্জ করতে যেতেন। অনেকে স্বাস্থ্যগত কারণে মুম্বাই থেকেই ফিরে আসতেন; তাঁদের বলা হতো ‘মুম্বাই হাজী’।

বর্তমানে প্রতি বছর প্রায় অর্ধলক্ষ মুসল্লি হজ্জ পালন করার জন্য বিমানযোগে মক্কায় যান। যাত্রার পূর্বে প্রস্ত্ততিমূলক ক্রিয়াদি সম্পন্ন করার জন্য যাত্রীদের অস্থায়ী আবাস হিসেবে ঢাকার উত্তরা মডেল টাউনে সরকারি উদ্যোগে ‘হাজী ক্যাম্প’ নির্মিত হয়েছে। হজ্জ পালনকারীরা নামের আগে ‘হাজী’ বা ‘আলহাজ্ব’ পদবি ব্যবহার করেন এবং তাঁরা মুসলিম সমাজে বিশেষ শ্রদ্ধার পাত্র হিসেবে বিবেচিত হন।  [সৈয়দ আশরাফ আলী]